১৯৯৮ সাল, বন্যার বিধ্বংসী জোয়ারে শত শত পরিবারের সম্মৃদ্ধি ভেসে গিয়েছিল, আর আমার জানা একটি পরিবারে আজন্ম কালের দুঃখ এসে তীরে ভীরেছিল। একই সাথে বন্যা, বৃষ্টি আর ঝড়ের প্রচন্ড তান্ডবে আমার দেখা সে গৃহকোনে নবজাতকের চিৎকার ধ্বনিত হচ্ছিল আকাশে-বাতাশে। আমার জন্ম নেওয়ার দুঃখ ইতিহাসে সে চিৎকারই ছিল শুধু এক অস্তিত্বের প্রমান। ঝড়ের দাপটে প্রদীপ নিভে যায় সারা গ্রাম অন্ধকার, নবজাতকের চিৎকার শুনে অন্তর কাঁদে ঠাকুর দাদার। নবাগত পুত্রের শিয়রে আলোর ব্যবস্থায় কিছু না শুনেই আমার দাদা ছুটেছিলেন এক টুকরো আলোর সন্ধানে। কে জানতো মোর বৃদ্ধ দাদু আসবে না আর ফিরে। পৃথিবীর মাঠে রাত থেমে ভোর নেমে প্রমান করে আমি আমার দাদুর স্বপ্ন রাখাল নই। তাই সুকুর নামটি ৩০ ডিগ্রী এ্যাংগেলে ঘুরে হয়ে যায় সুকুরন। আমি সেই সুকুরন, একটি দুঃখ, তবে সে দুঃখ এতো ছোট নয়। জন্মের সময়ই আমার বুকের বা'পাশে সূক্ষ একটি চামড়ার থলিতে কিছু একটা ঝুলছিল। একবর চুপসে যায় আরেকবার প্রসারিত হয়। গ্রামের এক ডাক্তার পড়ুয়া ছেলে বলেছিল ওটা হৃংপিন্ড।
আমার হৃৎপিন্ডটা বাইরে থেকে ঝুলছে, একটা অতি পাতলা চামড়ার থলিতে আর তার সংকুচন-প্রসারন বাইরে থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এই ব্যতিক্রম ঘটনা সবাই বেশ উপভোগ করে।
আমার শরীরের সমস্যা আর দিন দিন তাতে বাড়তে থাকা যন্ত্রনায় আমার কোন কষ্ট নেই। শুধু ভীষন কষ্ট হয় আমার বাবার কালো মুখখানা দেখে। মানুষ যতই সহানুভুতি আর দুঃখ প্রকাশ করে নিজেকে মহৎ প্রমানের চেষ্টা করুক না কেন, আজন্ম এ যন্ত্রনানুভুতি শুধু আমার বাবার ঘুমকেই হারাম করবে।
ছোট বেলায় কিভাবে ছুটেছি আমি জানিনা। যখন থেকে বুঝতে শিখেছি , আমার জন্য নয় আমার বাবার পানে তাকিয়ে আত্মাহত্যা করেছি। কিন্তু ক্ষতটাতো শরীরে, আত্মায় নয় । তাই সম্ভব হয়নি রক্তটানে ব্যথিত প্রিয় পরিবারকে মুক্তি দেওয়া।
হয়তো শারীরিক খুতসহ জন্মানোর দুর্বলতার দরুনই স্রষ্টার অদৃশ্য অস্তিত্বের প্রতি বিশ্বাসটা একটু বেশীই ছিল। আর তাঁরই বিধান স্মরনে শরীর আর আত্মাসহ গোটা আত্মহত্যার চিন্তাকে স্পষ্ট চিত্তে পত্যাখ্যান জানিয়েছি। শুধু বিশ্বাসে নিয়েছিলাম এ জগতের দুঃখ শেষে পরজগতের জান্নাত পাবার আশ্বাস।
তখন আমার প্রার্থনা ছিল-
হে আল্লাহ, আমার জীবনে যা কিছু ভাল কাজ হবে সব তোমার কাছে সঞ্চয় রেখো, তার তিল পরিমানও আমি ব্যয় করতে চাই না। আর যত অন্যায়, পাপ আছে সব কিছুর প্রতিদান আমাকে এ জগতে দাও। আমি এখানেই সব ব্যয় করে যেতে চাই। যত খারাপ তুমি আমায় এপারে রাখ। প্রয়োজনে আমায় তুমি এমন কঠিন শাস্তি দাও সেটা সহ্য করতে না যদি আমার মৃত্যুও হয়, সেও ভালো। কারন নিঃসন্দেহে এ জীবন ক্ষনস্থায়ী। দুঃখ যত কঠিনই হোক, মৃত্যুতে হলেও তার সমাপ্তি আসবে। কিন্তু ওপারে বহমানিত অনন্তকালের নিঃসঙ্গ আমিকে ক্ষমা জানিয়ে তোমার সাক্ষাত দিও। আর আজ থেকে মৃত্যু অবধি এ অধম জীবনের পাপিষ্ট জানালায় তোমার রহমতের কিরন দিতে দাও তা যেন হয় আমিমুক্ত এই সংসারে বাবা-ভাইদের মক্তির হাসি।
পৃথিবীর সব কষ্টের কফিনে জড়িয়ে আমাকে সমাধিস্থ করা হলেও আমার কোন দুঃখ নেই। দুঃখ আমার বাবাকে নিয়ে। তার কি অপরাধ, আমার জন্য তার জীবন কেন ভারী হল?
তার অন্তর্চিন্তা আর কষ্টানুভুতিটা আমার পক্ষে উপলব্ধি সম্ভব নয়। তাই আমার চারপাশের কারো প্রতিই আমার কোন অভিযোগ নেই
আমার এমন জীবনে শুধু আমার মা আমার কথা ভেবে কষ্ট পেতেন। কিন্তু কেউই কেন যেন আমাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারতো না। আমি তাদের স্বাভাবিক চিন্তার পথে অস্বাভাবিক বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছি। প্রতিনিয়ত আমাকে নিয়ে চিন্তা তাদের রক্তকে বিষিয়ে তুলছিল। আমার ভুল ধরার অপেক্ষায় সবাই প্রত্যেক মুহূর্তে প্রস্তুত ছিল আর তাই সন্ত্রস্ত থেকে আরও বেশী ভুল করতাম। এসব ঘটনায় সবাই খুব রেগে যায় এবং খুব স্বাভাবিকভাবে তাদের মুখ থেকে খারাপ ব্যবহার বেরিয়ে আসে। আমার প্রতি এ ব্যবহার তাদের অভ্যাসে একাত্ব হয়ে গেছে। প্রথম থেকেই ভীষন খারাপ লাগতো তবে নিজের অবস্থান জানতাম বলে নিজকেই লুকিয়ে রাখতাম।
বাবা-ভাইয়া যখন বাইরে থাকত তখনই সব কাজ গুছিয়ে রাখতাম আর তারা এসে পড়লেই লুকিয়ে পড়তাম। ঘরে ভাল কিছু রান্না হলেই সবাই একসাথে বসে খাওয়া-দাওয়া করতো। শুধু আমিই লুকিয়ে থাকতাম। আমার এই অনুপস্থিতিও আজ তাদের দীর্ঘ দিনের অভ্যাস।
সবাই যখন চলে যেত দীর্ঘ অপেক্ষা শেষে দ্বিগুন ক্ষুধা নিয়ে খতে আসতাম। আমার মা এসে আমার জন্য তুলে রাখা ভাল কিছু খাবার দিয়ে যেতেন।
আমার হৃৎপিন্ডটা বাইরে থেকে ঝুলছে, একটা অতি পাতলা চামড়ার থলিতে আর তার সংকুচন-প্রসারন বাইরে থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এই ব্যতিক্রম ঘটনা সবাই বেশ উপভোগ করে।
আমার শরীরের সমস্যা আর দিন দিন তাতে বাড়তে থাকা যন্ত্রনায় আমার কোন কষ্ট নেই। শুধু ভীষন কষ্ট হয় আমার বাবার কালো মুখখানা দেখে। মানুষ যতই সহানুভুতি আর দুঃখ প্রকাশ করে নিজেকে মহৎ প্রমানের চেষ্টা করুক না কেন, আজন্ম এ যন্ত্রনানুভুতি শুধু আমার বাবার ঘুমকেই হারাম করবে।
ছোট বেলায় কিভাবে ছুটেছি আমি জানিনা। যখন থেকে বুঝতে শিখেছি , আমার জন্য নয় আমার বাবার পানে তাকিয়ে আত্মাহত্যা করেছি। কিন্তু ক্ষতটাতো শরীরে, আত্মায় নয় । তাই সম্ভব হয়নি রক্তটানে ব্যথিত প্রিয় পরিবারকে মুক্তি দেওয়া।
হয়তো শারীরিক খুতসহ জন্মানোর দুর্বলতার দরুনই স্রষ্টার অদৃশ্য অস্তিত্বের প্রতি বিশ্বাসটা একটু বেশীই ছিল। আর তাঁরই বিধান স্মরনে শরীর আর আত্মাসহ গোটা আত্মহত্যার চিন্তাকে স্পষ্ট চিত্তে পত্যাখ্যান জানিয়েছি। শুধু বিশ্বাসে নিয়েছিলাম এ জগতের দুঃখ শেষে পরজগতের জান্নাত পাবার আশ্বাস।
তখন আমার প্রার্থনা ছিল-
হে আল্লাহ, আমার জীবনে যা কিছু ভাল কাজ হবে সব তোমার কাছে সঞ্চয় রেখো, তার তিল পরিমানও আমি ব্যয় করতে চাই না। আর যত অন্যায়, পাপ আছে সব কিছুর প্রতিদান আমাকে এ জগতে দাও। আমি এখানেই সব ব্যয় করে যেতে চাই। যত খারাপ তুমি আমায় এপারে রাখ। প্রয়োজনে আমায় তুমি এমন কঠিন শাস্তি দাও সেটা সহ্য করতে না যদি আমার মৃত্যুও হয়, সেও ভালো। কারন নিঃসন্দেহে এ জীবন ক্ষনস্থায়ী। দুঃখ যত কঠিনই হোক, মৃত্যুতে হলেও তার সমাপ্তি আসবে। কিন্তু ওপারে বহমানিত অনন্তকালের নিঃসঙ্গ আমিকে ক্ষমা জানিয়ে তোমার সাক্ষাত দিও। আর আজ থেকে মৃত্যু অবধি এ অধম জীবনের পাপিষ্ট জানালায় তোমার রহমতের কিরন দিতে দাও তা যেন হয় আমিমুক্ত এই সংসারে বাবা-ভাইদের মক্তির হাসি।
পৃথিবীর সব কষ্টের কফিনে জড়িয়ে আমাকে সমাধিস্থ করা হলেও আমার কোন দুঃখ নেই। দুঃখ আমার বাবাকে নিয়ে। তার কি অপরাধ, আমার জন্য তার জীবন কেন ভারী হল?
তার অন্তর্চিন্তা আর কষ্টানুভুতিটা আমার পক্ষে উপলব্ধি সম্ভব নয়। তাই আমার চারপাশের কারো প্রতিই আমার কোন অভিযোগ নেই
আমার এমন জীবনে শুধু আমার মা আমার কথা ভেবে কষ্ট পেতেন। কিন্তু কেউই কেন যেন আমাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারতো না। আমি তাদের স্বাভাবিক চিন্তার পথে অস্বাভাবিক বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছি। প্রতিনিয়ত আমাকে নিয়ে চিন্তা তাদের রক্তকে বিষিয়ে তুলছিল। আমার ভুল ধরার অপেক্ষায় সবাই প্রত্যেক মুহূর্তে প্রস্তুত ছিল আর তাই সন্ত্রস্ত থেকে আরও বেশী ভুল করতাম। এসব ঘটনায় সবাই খুব রেগে যায় এবং খুব স্বাভাবিকভাবে তাদের মুখ থেকে খারাপ ব্যবহার বেরিয়ে আসে। আমার প্রতি এ ব্যবহার তাদের অভ্যাসে একাত্ব হয়ে গেছে। প্রথম থেকেই ভীষন খারাপ লাগতো তবে নিজের অবস্থান জানতাম বলে নিজকেই লুকিয়ে রাখতাম।
বাবা-ভাইয়া যখন বাইরে থাকত তখনই সব কাজ গুছিয়ে রাখতাম আর তারা এসে পড়লেই লুকিয়ে পড়তাম। ঘরে ভাল কিছু রান্না হলেই সবাই একসাথে বসে খাওয়া-দাওয়া করতো। শুধু আমিই লুকিয়ে থাকতাম। আমার এই অনুপস্থিতিও আজ তাদের দীর্ঘ দিনের অভ্যাস।
সবাই যখন চলে যেত দীর্ঘ অপেক্ষা শেষে দ্বিগুন ক্ষুধা নিয়ে খতে আসতাম। আমার মা এসে আমার জন্য তুলে রাখা ভাল কিছু খাবার দিয়ে যেতেন।

