Saturday, June 2, 2018

"সুকুরন বিবি"


১৯৬৯ সালের ২৩ শে ফেব্রুয়ারী যখন শেখ মুজিবুর রহমান পেয়েছিল তাঁর বঙ্গবন্ধু উপাধি, তার ঠিক ১০ বছর আগে ১৯৫৯ সালে মাতৃগর্ভ থেকে ভুমিষ্ট হয় এক ফুটফুটে তনয়া। নাম সুকুরন।

জন্ম থেকে সুকুরন ছিল চেতনাশীল এক সাহসী প্রতিবাদী। নিজ পরিবার আর সমাজের প্রতি ছিল তাঁর অপরিসীম দায়িত্ববোধ। সে ভালবাসত তাঁর বাবাকে, শ্রদ্ধা করত পূর্বপুরুষদেরকে আর প্রার্থনা করত বাপ-দাদার ভিটায় এক যোগ্য উত্তরসূরী দেখার। কারন, সে জানত এই পরিবারে চিরদিন থাকার অধিকার এই সমাজ কেন, এই পরিবারই কোন একদিন তাঁকে দেবে না ।

রাত যখন গভীর হয়, পাখিরাও ঘুমাতে যায়, সকাল আসছে ভেবে প্রকৃতি যখন নিজেকে সাজাবার স্বপ্নে বিভোর, সুকুরন তখন নির্জন আঁধারে চোখের কোনে দুফোটা অশ্রু জন্ম দিত আর বর্নহীন স্মৃতির পৃষ্ঠায় লিখে জমাত নারী অবমাননার নিঃশব্দ অধ্যায়গুলো।

সুকুরন বড় হয়।
"সুকুরন মাইয়া মানুষ, বয়স ১০ হইয়াছে, ঢের দেরী হইছে, আর করন লাগলে মাইয়ার বিয়া দেওন লাগবোনারে ",বলল পাশের এক চাচী। বিয়ের জন্য ঠিক করে দেয় সে তাঁর ভাইয়ের ছেলেকে।

১৯৬৯ এর ৪ ফেব্রুয়ারী বদরুলের হাতে সকুরনের বাবা সুকুরনকে তুলে দিয়ে তার ভাষায় স্বামী সেবার মহান দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়। তার কথাগুলো সাহিত্যিক ভাষা্য় ট্রান্সলেট করলে উপদেশগুলো এরকম আসবে হয়তো -"মা, দেখনাই যার, চেননাই যারে, শোননাই নাম কভু, সে 'ই আজিকে দেবতা তোমার সে ই তোমার প্রভু"।

সুকুরনের চোখের জল সেদিন সোনামুড়ী গ্রামের সব কল্যান ধুয়ে দিয়ে গিয়েছিল।
শশুর যরে পথম দুইদিন সুকুরনের ভালই কাটছিল। দিন বৃদ্ধির সাথে সাথে তাঁর সাথে শশুরঘরের অত্যাচারের সীমা প্রসারিত হয়। 
শাশুরী বলেন, "বিয়ের সোমা  তোর বাপ যে দুই বিঘা জমি লেইখ্যা দিল তা আনবি কবে পুরামুখী"? অন্যদিকে বদরুলের নির্যাতনও সুকুরনকে আতংকিত রাখতো। একদিন বদরুলের করা একটি আঘাত সুকুরনের মাথার ঠিক মাঝখানে লেগেছিল আর তখন মনে হচ্ছিল সনাতনী নিয়মে কোন সদ্য বিবিহিতার কপাল জুড়ে সিদুর ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে । এরকম বদরুল তাঁকে প্রতিদিনই মারত আবার জমির কথা মনে পড়লে সুকুরনের প্রতি তার মনে এক বিন্দু কৃত্রিম ভালবাসারও জন্ম হত। তাই
দেখতে দেখতে সুকুরন হয়ে ওঠে দুই সন্তানের জননী। সন্তানদের নিয়ে পেরে না উঠায় একদিন স্বামীর ডাকে সাড়া দিতে পারেনি সুকুরন। অন্ধকারে স্বামী এসে সুকুরনের পায়ের উপর এক ভারী কাঠ ছুড়ে মারল।
চিকিৎসার অভাবে সুকুরনের পা'টা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যায়। তাই পরবর্তীতে তাঁর শাশুরী, স্বামীসহ  সবাই তাকে খোড়া বলেই ডাকত।

দেখতে দেখতে চলে এল ৭১ এর ২৫ শে মার্চ। বাংলার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল স্বাধীনতার ঘোষনা। শুরু হল মহান মুক্তিযুদ্ধ, অংশ নিল হাজার হাজর নিরস্ত্র বাঙালী। সুকুরন সেই সব মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতে লাগল । স্বামীর ভয়ে রাত দুপুড়ে সে মুক্তিবাহীনিদের সব কিছু এগিয়ে দিত।পা'টা খোড়া থাকায় ধীর গতির জন্য একদিন সে রাজাকারদের চোখে পড়ে যায়।
পরের দিন দাড়িওয়ালা, টুপিপড়া গোড়াইয়ের বাপ ও কিছু পাকবাহিনি সুকুরনের বাড়িতে গিয়ে সুকুরনের এক বছরের ছেলেটিকে গাছের সাথে আছাড় দিয়ে মেরে ফেলে। বদরুল ভয়ে পালিয়ে যায়। সুকুরন জ্বরে আক্রান্ত শাশুরিকে লুকাতে গিয়ে পাক বাহীনির হাতে ধরা পরে যায়, আর সেদিন ঘটে যায় বাঙালী নারীর জীবনে এক মর্মান্তিক ইতিহাস।

হোক ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। সবাই শান্তি ফিরে পেলেও বদরুল আক্রান্ত হয় কঠিন অসুস্থতায়। বদরুলের সব জায়গা-জমি বিক্রি করে সুকুরন তাকে চিকিৎসা করিয়েছে। বদরুল আজ নিজেই বাঁচবার আশা ছেড়ে দিয়েছে। হঠাৎ একদিন সুকুরনকে ডেকে তার কাছে ক্ষমা চায়, কার কাছে কত টাকা পাবে বলে দেয়, আর বলল- সামাদ মিয়া আমাগো মহা শত্রু, আমি মরে গেলে তুই কখনো ওর কাছে যাস না। স্বামীর শিয়রে বসা সুকুরনের দুগাল বেয়ে অশ্রু ঝড়ছিল, বেদনায় কাতর হয়ে উঠে বাঙালী নারী হৃদয়।

সুকুরন তাঁর বাবার বাড়িতে গেল। অসহায় পড়ে থাকা গ্রামের দিকে তাকিয়ে সুকুরন শব্দহীন হয়ে পড়ে সাথে জন্ম দেয় লবন জলের এক ছোট্ট হ্রদ। বাড়ির পথে পা রেখে দেখে তাদের বাড়ি-ঘর সব রাজাকাররা পুড়িয়ে দিয়েছে। তার দাদা, বাবা-মা, ভাই সবাই ৭১ এর স্রোতে ভেসে গেছে। শুধু এক কোনে পড়ে আছে ভাবি ও তিন ভাতিজি। অসহায় চারটা প্রানী ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে সুকুরনের দিকে যখন সে তার বাপের দেয়া দুই বিঘা জমি বিক্রি করে টাকা আনছিল।
বুক ফেটে যাচ্ছিল কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলার বা চোখের জল ছাড়া কিছু দেওয়ার ছিলনা সুকুরনের সেদিন।
শশুর ঘরে ফিরে আবার সুকুরন স্বামীর চিকিৎসা করাতে লাগল।ভাতের অভাবে ছেলেসহ সে রোজা রাখত। এভাবে ৫ মাস চিকিৎসার পর বদরুল সুস্থ হয়। আর না খেয়ে থাকতে থাকতে সুকুরন তার চেহারা, কর্মশক্তি সব হারাতে বসে। সুস্থ হওয়ার পর রোগা, পঙ্গু সুকুরনকে আর তার ভাল লাগে না।একদিন বিড়ি ধরানোর আগুন দিতে দেরি হওয়ায় খারাপ শব্দে, মুখের ভাষায় বদরুল সুকুরনকে তালাক দিয়ে দেয়। ইসলাম ধর্মে স্বামীর মুখের ভাষায় তালাক মেনে সুকুরন  নিরব, নিস্তব্ধ, মূর্তিমান পাথর হয়ে যায়। সেদিন সুকুরন নিরব হয়েছে, আজও কথা বলার শক্তি ফিরিয়ে আনেনি। চিরদিনের মত নির্বাক হয়ে যায় ৫৯ এর সে সম্ভাবনাময় জীবন।
মাকে হারিয়ে সুকুরনের সে ছেলেটি চোখে পশ্ন নিয়ে তাকায় সব মহিলাদের দিকে। কার ভিতর তার মা লুকিয়ে আছে সেই আশায় ? খেতের টমেটো চিরে চিরেও সে তার ভিতর মায়ের অস্তিত্ব খোঁজে ।

কী জানি তার মা হয়তো আজও এক শাড়িতে নির্বাক মুখে শুন্যে তাকিয়ে শ্রষ্ঠার সৃষ্টির নির্মম রহস্য জানতে চাইছে '।
এদেশে জন্ম নেওয়া একটি মেয়ে এ দেশের জন্য, স্বাধীনতার জন্য, দেশের মানুষের জন্য কত দাম দিল, কত ত্যাগ দানিল, এদেশের মানুষ তা বুঝল না ।

No comments:

Post a Comment

প্রিয় আরিয়ান

প্রিয় আরিয়ান, তোমার লিখতে শেখার প্রতিক্ষায় আমি, একটি ডায়েরি দেবো বলে। সুখেও আমার কান্না ঝরে, তোমায় ভালবেসে। একুশ শতকের আজক...